কারাগার থেকে আধার রাতের বন্দিনীর লেখক মাওলানা আমিরুল ইসলামের হৃদয় বিদারক চিঠি

কারাগার থেকে একজন মাজলুম আলেমের অশ্রুভেজা চিঠিঃ

আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় দ্বীনি ভাই, স্নেহের ছাত্র, পরম শ্রদ্ধেয় পাঠক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীগণ, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। 

কারাগার থেকে আধার রাতের বন্দিনীর লেখক মাওলানা আমিরুল ইসলামের হৃদয় বিদারক চিঠি

কারাগারের এই নিথর, অন্ধকার চার দেয়ালের মাঝে বসে আজ ২৬টি বছর পার হয়ে গেল। ২৬টি বছর! একটি দীর্ঘ জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময়। আজ আমার অবরুদ্ধ, কম্পিত কলমটি যখন হাতে তুলে নিয়েছি, তখন চোখের পানিতে কাগজের বুক ভিজে যাচ্ছে। যে হাত দিয়ে সারাজীবন ইসলামের সুমহান বাণী, ইলমে দ্বীনের আলো আর তাওহীদের দাওয়াত লিখে এসেছি, আজ সেই হাত শিকলে বন্দি। যে চোখগুলো সবসময় উম্মতের কল্যাণের স্বপ্ন দেখতো, আজ ২৬ বছর ধরে তারা লোহার শিকের ওপাশে শুধু শূন্যতা হাতড়ে বেড়ায়।

একদিন আমার লেখনীতে ফুটে উঠেছিল “আঁধার রাতের বন্দিনী”র করুণ আখ্যান, কিংবা “ফিলিস্তিনের রূপসী কন্যা”র বুকফাটা আর্তনাদ। আজ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, আমি নিজেই গত ২৬ বছর ধরে এক আঁধার রাতের চিরস্থায়ী বন্দি! দীর্ঘ ২৬টি বসন্ত আমি দেখিনি। দেখিনি কেমন করে সকালের সূর্য ওঠে, কেমন করে গোধূলির আলো মিলিয়ে যায়। তারুণ্যের যে উদ্দীপনা নিয়ে দ্বীনের খেদমতে নেমেছিলাম, এই লোহার খাঁচা আজ আমার সেই যৌবনকে কেড়ে নিয়ে বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমার চুল- দাড়ি পেকে সাদা হয়ে গেছে, শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে, কিন্তু এই নির্মম চার দেয়াল একটুও বদলায়নি।

কারাগার থেকে আধার রাতের বন্দিনীর লেখক মাওলানা আমিরুল ইসলামের হৃদয় বিদারক চিঠি

লেখক মাওলানা আমিরুল ইসলাম

মনে পড়ে গাজীপুরের শ্রীপুরের সেই চেনা মাটির গন্ধ, বরমী জামিয়া আনোয়ারিয়ার সেই মুখরিত আঙিনা, আর দারুল উলূম দেওবন্দের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানিতে ইলমের তৃষ্ণা আমাকে থামতে দেয়নি। শিক্ষকতার টেবিলে বসে যখন আপনাদের নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকাতাম, তখন যে আলোর বিচ্ছুরণ দেখতাম, আজ এই নিঝুম প্রকোষ্ঠে ২৬ বছর ধরে সেই মুখগুলো বড্ড বেশি মনে পড়ে। ২৬টি বছর আমি কোনো ছাত্রের মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে পারিনি, কোনো মাদ্রাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাদিসের দরস দিতে পারিনি।

আমার পরিবার, আমার কলিজার টুকরো সন্তানেরা, যাদের আমি অবুঝ শিশু রেখে এসেছিলাম, আজ তারা বড় হয়ে গেছে আমার ছায়া ছাড়াই। আমার বৃদ্ধা মা, আমার জীবনসঙ্গী আজ ২৬ বছর ধরে আমার পথ চেয়ে চাতক পাখির মতো প্রহর গুনছেন। একটা মানুষের জীবন থেকে ২৬টি বছর অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়ার চেয়ে বড় যাতনা আর কী হতে পারে? আমি জানি, আপনারা আমার জন্য কাঁদছেন, আমার মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলছেন। আপনাদের এই কান্না, এই দোয়া বৃথা যাবে না। মজলুমের অশ্রু আল্লাহর আরশকে কাঁপিয়ে তোলে।

হে আমার প্রিয় পাঠক, ছাত্র এবং দেশবাসী!  একজন আলেম, একজন শিক্ষক, একজন লেখক হিসেবে কি আমার অপরাধ এটাই ছিল যে আমি সমাজকে আলোর পথ দেখাতে চেয়েছিলাম? আমার লেখা ৩৫টি গ্রন্থ আজ লাইব্রেরির তাকে তাকে শোভা পায়, কিন্তু সেই গ্রন্থের লেখক ২৬ বছর ধরে অন্ধকার কুঠুরিতে তিলে তিলে মরছে। আর কতদিন? আর কতকাল আমাকে এই নির্জন খাঁচায় বন্দি থাকতে হবে? বিবেকবান মানুষের কাছে কি আমার এই দীর্ঘ ২৬ বছরের কান্নার কোনো মূল্য নেই? আপনারা কি আমার এই বন্দি জীবনের অবসান চান না?

কারাগারের এই নির্জনতায় কেবল আল্লাহই আমার একমাত্র সঙ্গী। তাঁর ফয়সালার ওপর আমি সন্তুষ্ট। তবে একজন মানুষ হিসেবে, একজন মজলুম হিসেবে আমি আজ আপনাদের কাছে, পুরো দেশবাসীর কাছে এবং বিশ্ব বিবেকের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি আমার এই দীর্ঘ ২৬ বছরের বন্দিত্বের অবসান হোক। আমাকে আমার পরিবার, আমার ছাত্র আর আমার প্রিয় কলমের কাছে ফিরে যেতে দিন। আমার মুক্তির জন্য আপনারা আপনাদের কণ্ঠ সোচ্চার করুন।

নিশ্চয়ই কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। অন্ধকার রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত নিকটে আসে। আপনাদের দোয়া আর ভালোবাসাই আমার বেঁচে থাকার শেষ সম্বল।

আপনাদের দোয়ার ভিখারী,

মাওলানা আমিরুল ইসলাম

২৬ বছরের দীর্ঘ অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url